বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) উপ-সহকারী প্রকৌশলী এ টি এম সাইদুর রহমান যেন দুর্নীতি, অনিয়ম আর নির্লজ্জ সুবিধাবাদের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। ঘুষের রাজত্ব কায়েম, ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার এবং ঠিকাদারদের জিম্মি করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার পাশাপাশি, ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে গিরগিটির মতো রং বদলানোর এক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই কর্মকর্তা। সিসিকের ৪টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি মূলত নিজের পকেট ভারী করার এক মহোৎসবে মেতে উঠেছিলেন।
রাজনৈতিক ডিগবাজি ও নির্লজ্জ এই সুবিধাবাদের মূল বাড়ি কুমিল্লায় হলেও বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহপরান ও টিলাগড় এলাকায় রীতিমতো ত্রাস ও প্রভাব বিস্তার করেন সাইদুর। সাবেক সরকারের সময়ে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রুহেল আহমদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে টিলাগড় গ্রুপের ছত্রছায়ায় সিসিকের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। ৫ আগস্টের আগে দাপট দেখিয়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের লোক বলে জাহির করতেন। অথচ সরকার পতনের পর পিঠ বাঁচাতে রাতারাতি সুর বদলে এখন নিজেকে বিএনপি নেতা এহসানুল হক মিলনের অনুসারী বলে নির্লজ্জের মতো পরিচয় দিচ্ছেন।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগে এই বহুরূপী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিলেট মহানগরীর একাধিক থানায় ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘুষের রামরাজত্ব ও ঠিকাদারদের জিম্মি দশায় সিসিকের ১২, ২৫, ৩২ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব পেয়ে সাইদুর রহমান মূলত একটি ‘ঘুষের সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছিলেন। বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন ফার্মের পাওনা বিল দ্রুত ছাড় করার টোপ দিয়ে ঠিকাদারদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তার প্রধান কাজ। মোটা অঙ্কের কমিশন বা ঘুষের টাকা ছাড়া এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কলম থেকে কোনো ফাইলেই স্বাক্ষর বের হতো না। ঠিকাদারদের কাছে তিনি এক মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবেই পরিচিত।
সরকারি অফিসে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যেন কোনো কাজই নেই! অফিসে এসে কেবল হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই তিনি উধাও হয়ে যান। সিসিকের বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়েও তার পুরো সময় কাটে নিজের অবৈধ টাকায় গড়া সুবিশাল গরুর খামারে। মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকি তো করেই না, উল্টো খেটে খাওয়া গরিব শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি আটকে রেখে তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মজুরি আটকে রাখার তার অভিনব সব কূটকৌশলে অতিষ্ঠ অসহায় শ্রমিকরা।
কালো টাকার পাহাড় ও বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ
লুটপাটের টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা সাইদুর রহমান সিলেটের মাটিতে অবৈধ সম্পদের পাহাড় জমিয়েছেন। সিলেটের খাদিম এলাকায় বিশাল জায়গা জুড়ে গড়ে তুলেছেন অত্যাধুনিক গরুর খামার এবং নির্মাণ করেছেন রাজকীয় বিলাসবহুল এক প্রাসাদ। একজন সাধারণ উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বৈধ আয়ে কীভাবে এত অল্প সময়ে এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় বিরাজ করছে।
এতোসব পাহাড়সমান দুর্নীতি ও অপকর্মের বিষয়ে এই বিতর্কিত কর্মকর্তা এ টি এম সাইদুর রহমান গণমাধ্যমে জানান, স্বভাবতই তিনি নির্লজ্জভাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে দায়িত্ব পালনের খোঁড়া অজুহাতে স্থানীয় সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর রুহেলের সাথে তার ‘সুসম্পর্কের’ কথা তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। নগরবাসীর এখন একটাই দাবি ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে এই বহুরূপী দুর্নীতিবাজ যেন পার পেয়ে না যায়। অনতিবিলম্বে তার অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
Leave a Reply